পবিত্র কোরআন
থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা
(২য় খন্ড)

দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূলগণই একমাত্র ইমাম বা নেতা এবং আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে সেদিন রসূলগণই একমাত্র সুপারিশকারী

রসূলগণ ব্যতীত অন্য কাউকে ইমাম বা নেতা হিসেবে আনুগত্য করার কথা কোরআনে উল্লেখ নেই। আবার রসূলগণ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তিকে ইমাম বা নেতা হিসেবে আনুগত্য করলে সেই আনুগত্য রসূলের হবে এমনও কোনো আয়াত কোরআনে নেই। বিধায় সেই সকল ইমামগণের আনুগত্য একত্ববাদে আসছে না। যে সকল ইমামগণ রসূল নহে এজন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূলগণের আনুগত্যের পরেও যারা এমন কোনো ব্যক্তিকে ইমাম সাব্যস্ত করে তাদের আনুগত্য করল, সে আনুগত্য আল্লাহর খতিয়ানভুক্ত হয় না। বিধায় উক্ত ইমামগণের আনুগত্য করা দ্বীনের ক্ষেত্রে ত্রী-তত্ত্বের সামিল হয় বিধায় সেই সকল ইমামগণের আনুগত্য একত্ববাদে গণ্য হচ্ছে না। পক্ষান্তরে রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য আল্লাহর হচ্ছে (সূরা-নেছা, আয়াত-৮০)। আর তাই দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূলের আনুগত্য করাকে একত্ববাদে আনা যাচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে একমাত্র রসূল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তিকে দ্বীনের ইমাম সাব্যস্ত করে আনুগত্য করলে একত্ববাদে আসছে না। বিধায় দ্বীনের ক্ষেত্রে ত্রী-তত্ত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ বিশ্বাস কর ও রসূল বিশ্বাস কর, তিন বলিওনা (সূরা-নেছা, আয়াত-১৭১)। আর মুশরিকরা বা তিন তত্ত্বে বিশ্বাসীগণ বলেন "আল্লাহতো তিনের মধ্যে একজন।" (সূরা-মায়েদা, আয়াত- ৭৩)। এই দুই আয়াত অনুসারে দ্বীনের ক্ষেত্রে ত্রী-তত্ব শেরেকে গণ্য হবে বিধায় যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে একমাত্র রসূল ব্যতীত ৩য় কোনো ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে তার অনুগত্য করলে সেটা অবশ্যই শেরেকে গণ্য হবে। দ্বীনের ক্ষেত্রে যেহেতু রসূল ব্যতীত কেউ আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী নয়, বিধায় সেদিন একমাত্র রসূলগণই ইমাম বা নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিবেন। কারণ দ্বীনের ক্ষেত্রে যিনি আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী নয় এমন কোনো ব্যক্তি সেদিন ইমাম বা নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাই রসূলগণই একমাত্র ইমাম এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই কারণে যারা রসুল নহে এমন ব্যক্তিকে দ্বীনের ক্ষেত্রে ইমাম সাব্যস্ত করে তার আনুগত্য, অনুসরণ করলে সেটা শেরেকে গণ্য হবে। আর তাই সেদিন প্রত্যেক মানুষ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে ইমাম বা নেতাগণকে উপস্থিত করা হবে। (সূরা-বনি ইসরাইল, আয়াত- ৭১)। রসূলগণই সেদিন ইমামের দায়িত্ব পালন করবেন। এই জন্য আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক উম্মতের বা সম্প্রদায়ের কাছে আমি রসুল পাঠাই। (সূরা ইউনুস : ৪৭) পূর্ব অধ্যায়ের আলোচনার মতে সম্যক গুরুগণই রসূল। অর্থাৎ যার যার গুরু তার তার রসূল, আর সেই রসূলগণকেই সেদিন আল্লাহ ইমাম বা নেতা হিসেবে আহ্বান করবেন।
আর এই রসূলগণই সেদিন সাক্ষীগণের দায়িত্ব পালন করবেন। সেই লক্ষ্যে সেদিন নবীগণ ও সাক্ষীগণকে উপস্থিত করা হবে। (সূরা যুমার : ৬৯) এই আয়াতে স্বাক্ষীগণ বলতে সম্যক গুরুগণ অর্থাৎ রসূলগণকে বুঝানো হয়েছে। আর নবীগণ তাদের সঙ্গীদের তথা সাহাবীদের বিষয়ে সাক্ষীদাতা হবেন। আর তার সাহাবীরা (রিসালাতপ্রাপ্ত) সাক্ষদাতা হবেন তার পরবর্তী মানুষের জন্য। (সূরা-হজ, আয়াত-৭৮)। আর নবী (স.)-কে আনা হবে রসূলগণের সাক্ষ্যকে যাচাই করার জন্য (সূরা-নাহল, আয়াত-৮৯)। অর্থাৎ রিসালাতের ধারাবাহিকতা সঠিক কিনা তা যাচাই করবেন নবী মোহাম্মদ (স.)। যাদের রেসালাতের ধারাবাহিকতা নবী (স.) দ্বারা সঠিক বলে সনাক্ত হবেন, সেই সকল গুরুগণ অর্থাৎ রসূলগণ আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে তার অনুসারিদেরকে সুপারিশ করবেন। আল্লার অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবেন না (সূরা-ইউনুস, আয়াত- ৩)। আল্লার অনুমতি ব্যতীত কেউ কোনো কথা বলতে পারবেন না। সকল সুপারিশ একমাত্র আল্লাহরই নিকট। (সূরা-জুমার, আয়াত-৪৪)। আল্লাহ ছাড়া কোনো সুপারিশকারী নেই। (সূরা-সেজদা, আয়াত-৪) আল্লার অনুমতি ব্যতীত কাহারো সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না। (সূরা-সাবা, আয়াত-২৩ )। যারা রসূলের আনুগত্য করে নেই তারা ইবলিসের অনুসারী বলে গণ্য, আর তাই তাদেরকে আল্লাহ পছন্দ করে না, আর পছন্দ করে না বিধায় তাদেরকে সুপারিশের কোনো অনুমতি দিবেন না। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন ও আল্লাহ যার কথা পছন্দ করে সে ব্যতীত কাহারো সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না। (সূরা-ত্বাহা, আয়াত-১০৯)। সাফায়েত প্রাপ্তির জন্য সম্যক গুরুর নিকট তথা রসূলের নিকট দ্বীনের আনুগত্যের বায়াত গ্রহণই একমাত্র পথ।

আদম (আঃ)-এর ইবলিস মুক্তি

আল্লাহ আদমকে তৈরি করে বলেলন, হে আদম তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর কিন্তু কখনো এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হও না। (সূরা-বাকারা, আয়াত-৩৫) ইবলিস আদমকে বিপথগামী করার জন্য অঙ্গীকার করল। (সূরা-হিজর, আয়াত-৩৯) আর এই লক্ষে ইবলিস আল্লাহর নিকট থেকে অবকাশ প্রাপ্তির আবেদন করলেন। (সূরা-হিজর, আয়াত-৩৬) এবং পুনঃউত্থান দিবস পর্যন্ত তাকে এই বিষয়ে অবকাশ দিলেন। (সূরা-হিজর, আয়াত-৩৭) সে তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে কুমন্ত্রণা দিল (সূরা-আরাফ, আয়াত-২০) (সূরা-তাহা, আয়াত-১২০)। ক্রমে ক্রমে ইবলিস আদমের উপর প্রভাব বিস্তার করল (সূরা-মুজাদালা, আয়াত-১৯) । ফলে আদম, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষ-ফলের আস্বাদ গ্রহণ করল (সূরা-আরাফ, আয়াত-২২)। তখন তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ পেল (সূরা-আরাফ, আয়াত-২২)। কারণ তারা শয়তানের দলভুক্ত হয়েছে অর্থাৎ তারা শয়তান সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছে (সূরা-মুজাদালা, আয়াত-১৯)। তখন তারা ভ্রমে পতিত হইল (সূরা-তাহা, আয়াত-১২১)। তখন তারা বলিল, হে প্রভু আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর (সূরা-আরাফ, আয়াত-২৩)। তখন আল্লাহ বললেন, আমি কি তোমাদের বলিনি "এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হযে পড়বে" (সূরা-আরাফ, আয়াত-২২)। আদম প্রভুর নিকট থেকে কিছু বাণী প্রাপ্ত হলেন অর্থাৎ তওবা করলেন। (সূরা-বাবারা, আয়াত-৩৭)। প্রভু তাকে মনোনিত করলেন এবং তার তওবা কবুল করলেন (সূরা-তাহা, আয়াত-১২২)। ফলে প্রভু তাকে ক্ষমা করলেন (সূরা-বাবারা, আয়াত-৩৭)। কিন্তু তাকে শয়তান মুক্ত করলেন না। কারণ যদি আল্লাহ আদমকে ইবলিস থেকে পৃথক করে তাকে ইবলিস মুক্ত করে পবিত্র করে তাহলে তাকে জান্নাতে রেখে দিতে হয়। আর যদি আদমকে জান্নাতে রেখে দেয়, তাহলে আল্লাহর বিচার ব্যবস্থা ইবলিসের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ যখন ইবলিস আল্লাহর হুকুম অমান্য করল। (সূরা-তাহা, আয়াত-১১৬)। ফলে আল্লাহ বললেন, এই স্থান হইতে তুমি নেমে যাও (সূরা-আরাফ, আয়াত-১৩) (সুরা হিজর-৩৪)। ঠিক একইভাবে আদমও আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী (সূরা-তাহা, আয়াত-১২১)। আল্লাহর হুকুম অমান্য করার কারণে যদি ইবলিস জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয় তাহলে আদমও নিশ্চয়ই সেই জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হবে। কারণ যেহেতু আদম ও ইবলিস উভয়ই আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী বলে গণ্য এজন্য আল্লাহ আদমকে ইবলিস মুক্ত না করে ইবলিস সংশ্লিষ্ট অবস্থায় তাদের উভয়কে একই সঙ্গে জান্নাত থেকে নামিয়ে দিলেন তবে পরস্পর শত্রু হিসাবে (সূরা-তাহা, আয়াত-১২৩)। এখানে উভয়কে বলতে আদম ও শয়তানকে বুঝানো হয়েছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন কোরআন অনুবাদ টীকা নং-১০৬৩)। পরে আল্লাহর নিকট থেকে যে নির্দেশ আসবে সে নির্দেশ অনুসরণ করবে তাহলে আর বিপথগামী হবে না (সূরা-তাহা, আয়াত-১২৩)। অর্থাৎ তখনই আদম পবিত্র হবে। তাহলে দেখা গেল আল্লাহ আদমকে ক্ষমা করলেন কিন্তু তাকে ইবলিসের প্রভাব থেকে নিরাপদ না করেই পৃথিবীতে নামিয়ে দিলেন। এবং পরে ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য তিনি পথ নির্দেশ দিবেন বলে জানিয়ে দিলেন। (সূরা-তাহা, আয়াত-১২৩)
এই মর্মে আল্লাহ বলেন যে যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তাহলে তুমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে (আরাফ-২০০) (হামিম-৩৬) এই আয়াতে ইস্তায়িযু শব্দ এসেছে ইস্তায়িযু শব্দের অর্থ হচ্ছে আশ্রয় প্রার্থনা করা (আরবী অভিধান পৃষ্ট নম্বর ২৩০)। এখানে উল্লেখ যে, যেহেতু আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান (বাকারা-২০)। সেহেতু শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে কেহ আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেই আল্লাহ নিজ ক্ষমতা বলে ইবলিসকে প্রতিহত করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ ইবলিসের ক্ষেত্রে এমনটি করবে না। কারণ ইবলিস, আদমকে ও বনি আদমকে পথভ্রষ্ট করবে মর্মে আল্লাহর কাছ থেকে পূর্বেই ক্ষমতা বা অনুমতি বা অবকাশ চেয়েছিল (হিযর-৩৬)। আর আল্লাহ তখন ইবলিসকে সেই বিষয়ে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত ক্ষমতা, বা অনুমতি, বা অবকাশ দিয়েছেন (হিযর-৩৭)। এতে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত ইবলিসের কার্যক্রমে বাধা দিবেন না, কিংবা কারও কথা মত তাকে প্রতিহত করবে না। যদি আল্লাহ এমনটি করে তাহলে আল্লাহ ইবলিসের সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বলে গণ্য হয়। কিন্তু আল্লাহ কারও সাথে অঙ্গিকার করলে তা রক্ষা করে (বাকারা-৪০) আর যদি আল্লাহ ইবলিসের সাথে কিছূ অঙ্গিকার বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে আল্লাহ ইবলিসের উপর জুলুম করল প্রতিয়মান হয়। কিন্তু আল্লাহ কাহারো প্রতি জুলুম করে না (কাহফ-৪৯) উপরোক্ত আলোচনা প্রমাণ হয় যে, কেহ আল্লাহর কাছে এই বিষয়ে আশ্রয় চাহিলে আল্লাহ নিজ ক্ষমতা বলে তাকে ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করবে বা ইবলিসকে প্রতিহত করবে এমন নয় বরং যখন আদম আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাহিল তখন তাকে এমন একটি আশ্রয় এর সন্ধান দিল, যেখানে ইবলিসের অনুপ্রেবেশ ঘটার আশঙ্কা নেই। ইবলিস তো আসমান-জমিনের সকল জায়গায় বিচরণ করিতে সক্ষম। এক মাত্র আদম কাবাই সেজদাকারীর সাথে ইবলিস অবস্থান করে না। কারণ ইবলিস আদম কাবাই সেজদা না দিয়ে কাফির (বাকারা-৩৪) আর তাই ইবলিস কখনো আদম সেজদার সামিল হবে না। (হিজর-৩৩) কিন্তু আদম যখন নিজেই ইবলিস দ্বারা আক্রান্ত অর্থাৎ ইবলিস সংশ্লি¬ষ্ট হয়ে পড়েছে (মুজাদালা-১৯) আর আদম কাবা সেজদা দেওয়াই ইবলিস থেকে মুক্তি একমাত্র উপায়। সেক্ষেত্রে আদমের জন্য ইবলিস মুক্তির উপায় কি? কোথায় সেজদা দিয়ে আদম ইবলিস থেকে মুক্তি লাভ করবে। এজন্য আদম যখন আল্লাহর কাছে ইবলিস থেকে মুক্তির জন্য আশ্রয় চাইল (আরাফ-২০০) আল্লাহ তখন জানিয়ে দিলেন, 'ওয়া আকিমু ওয়াজু হাকুম ইন্দা কুলি¬ মাসাজিদিউ' (আরাফ -২৯) অর্থ হচ্ছে প্রত্যেক সেজদার সময় তোমাদের নিজের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর। এই আয়াতে ওয়াজহুন শব্দ এসেছে। ওয়াজহুন অর্থ হচ্ছে চেহারা বা মুখম-ল। (আরবি অভিধান পৃষ্ঠা নম্বর-২৫২৮) এই আয়াতে কাই-ইমু শব্দ এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে চিরস্থায়ী। (আরবী অভিধান. পৃ. নং ২০১৪) পবিত্র কোরআনে এই শব্দের অর্থটা কায়েম করা বা প্রতিষ্ঠিত করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ কেউ এই "আকিমু ওয়াজুহাকুম" শব্দের অর্থ তোমাদের মুখম-ল সোজা রাখ অর্থে ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য সকল আয়াতে কায়েম করা বা প্রতিষ্ঠিত করা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এই আয়াতে কায়েম করা বা প্রতিষ্ঠিত করা অর্থৈ ব্যবহার না করে সোজা রাখা অর্থ করলে আয়াতে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। কারণ সেজদার সময় মুখম-লটা অবশ্য নত করে কপাল, নাক, মাটিতে স্পর্শ করা লাগে। সেক্ষেত্রে যদি মুখম-ল নত না করে খাড়া ভাবে বা সোজাভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে তাহলে তো সেজদা করা হল না। সেটা হল দাঁড়ানো অবস্থা। কিন্তু দাঁড়ানো অবস্থা এবং সেজদা অবস্থা এক নয়। কারণ একই আয়াতের মধ্যে দাঁড়ানো এবং সেজদার কথা উল্লেখ্য এসেছে (সূরা হজ, আয়াত ২৬)। এতে প্রমাণ হয় দাঁড়ানো এবং সেজদার বিষয়টি আলাদা। কাজেই সেজদার সময় নিজের চেহারাকে অন্তরে বা দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত করতে বা কায়েম করতে বলা হয়েছে এটা নিশ্চিত। আর একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, সালাত বা সেজদা কায়েম করা একটি বিষয আর চেহারা কায়েম করা এটা আর একটি বিষয়। সূরা বাকারা, ৪৩ নং আয়াতে সালাত বা সেজদা কায়েম করতে বলা হয়েছে। আর সূরা আরাফ ২৯ নং আয়াতে চেহারা কায়েম করার কথা বলা হয়েছে। তাহলে দুইটি বিষয়, দুইটি আয়াত, দুইটি আয়াতের উদ্দেশ্যও দুইটি। সেক্ষেত্রে যদি কেউ চেহারা কায়েম করা আয়াতকে সেজদা কায়েম করা অর্থে ব্যবহার করে তাহলে চেহারা কায়েম করা আয়াতের যে উদ্দেশ্য ছিল সেটা ব্যর্থ হবে। অতএব এটা পরিহার যোগ্য। বরং এই আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেজদার সময় ইবলিসকে প্রতিহত করে একনিষ্ঠভাবে বিশুদ্ধচিত্তে প্রভুর স্মরণের উদ্দেশ্যে ঐ সময় এমন একটি চেহারাকে স্মরণে প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে, যে চেহারা ইবলিস সহ্য করতে পারে না। ইবলিস সেজদার সময় একমাত্র আদম (আ.)-এর চেহারা সহ্য করে না। কারণ ইবলিস আদমকাবাই সেজদাকারীর সামিল হবে না। (হিজর-৩৩)। কারণ ইবলিস আদম কাবাই আল্লাহকে সেজদা না দিয়েই কাফির। (বাকারা-৩৪)। আর এই জন্য আদমকে ইবলিস থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রত্যেক সেজদার সময় আদমের নিজের চেহারাকে (স্মরণে) প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে। আর আদম কাবাই সেজদার স্মরণের মাধ্যমেই ইবলিসকে দূরীভূত করা সম্ভব। আর এই কাজটির নামই সালাত। অর্থাৎ যে কাজটি করলে ইবলিস দূরীভূত হয় সেই কাজটিই সালাত। (আনকাবুত-৪৫)। এই আয়াতে নাহাইয়া শব্দ এসেছে যার অর্থ হচ্ছে, দূরীভূত করা। (আরবী অভিধান, পৃ. ২৩৮৩)। সেক্ষেত্রে সেজদায় সালাত আর সালাত হচ্ছে ইবলিস দূরীভূত করার প্রক্রিয়া। আর ইবলিস দূরীভূত একমাত্র আদম কাবাই বা আদম চেহারাই সেজদার মাধ্যমে। আর তাই সূরা আরাফ এর ২৯ নং আয়াতে ইবলিসকে দূরীভূত করতেই প্রত্যেক সেজদার সময় দৃষ্টি এমন একটি চেহারা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে চেহারা ইবলিস সহ্য করতে পারে না। আর নবীদের ক্ষেত্রে সেই চেহারাটা হচ্ছে নবীদের নিজের চেহারা। যেহেতু আদম নবী আর তাই আদম ইবলিস থেকে মুক্তির জন্য নিজের চেহারাই সেজদা দিয়েই ইবলিস মুক্ত হয়েছে এটা নিশ্চিত। এই নির্দেশ পাওয়ার পর আদম (আঃ) তার নিজের চেহারা অনুমান করল এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় তার নিজের চেহারা দেখল এবং দৃষ্টিতে তার নিজের চেহারা আয়ত্ব করল। অতঃপর নিজের চেহারা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করে সেজদা দিল এবং সেজদায় গিয়ে নিজের চেহারা স্মরণ করল তখন সে ইবলিস মুক্ত হল। কারণ ইবলিস তো আদম চেহারায় সেজদাকারীর সামিল হবে না। (হিজর-৩৩) ইবলিশ নিজেই আদমের দেহ মন থেকে পৃথক হয়ে গেল। সে ক্ষেত্রে ইবলিশের প্রতি জুলুম করা হয় নি। কারণ সে নিজেই আদম থেকে পৃথক হল। আল্লাহ কারও উপরে জুলুম করে না। (কাহফ-৪৯) তারপর থেকে যতবার আদম শয়তানের কুমন্ত্রণা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে তখনি সে সেজদায় গিয়ে নিজের চেহারা স্মরণ করত, ফলে সে ইবলিস মুক্ত হত। তাৎক্ষণিকভাবে তার চোখ খুলে যেত। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, 'যারা তাকওয়া অর্জনকারী তাদেরকে শয়তান যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা যেন (আদমকাবাই সেজদা দেওয়ার স্মৃতিকে) স্মরণ করে (আরাফ-২০১) এই আয়াতে ইত্তাকাই শব্দ এসেছে ইত্তাকাই শব্দের অর্থ হচ্ছে দুরে রয়েছে। (আরবী অভিধান, পৃষ্ঠা নম্বর ২৮) এখানে উল্লেখ যে, যারা আদম কাবাই সেজদাকারী তারা ইবলিস থেকে দূরে আছে। কারণ ইবলিস কখনো আদম কাবায় সেজদাকারীর সামিল হবে না। (হিজর-৩৩) তাহলে তাকওয়া অর্জনকারী মুত্তাকী বা মমিন বা সাবধানকারী বলতে আমরা তাকেই বুঝব যারা আদম কাবায় সেজদা করে ইবলিস থেকে দূরে রয়েছে বা আত্মিক পবিত্রতা অর্জন করেছে। এই আয়াতে তাদের কথা উল্লেখ করেছে। তারা যখনি ইবলিসের কুমন্ত্রণা দ্বারা আক্রান্ত হবে (আদম কাবাই সেজদার কথা) তখন স্মরণ করলেই ইবলিস থেকে মুক্তি লাভ করবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের চোখ খুলে যাবে (আরাফ-২০১)। এইভাবে আদম ইবলিস থেকে মুক্তি লাভ করলেন।

রসূল তোমাদেরকে ইবলিসমুক্ত করে পবিত্র করবেন

বনি আদমগণের জন্য ইবলিস মুক্তির পথ নির্দেশ এল। তোমাদের মধ্যে থেকে তোমাদের কাছে রসুল পাঠাই এবং সেই রসুল তোমাকে পবিত্র করবে (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৫১)। এখানে উল্লেখ্য যে, আদম সন্তানদের জন্য আদম (আঃ) নিজেই রসুল ছিলেন। কারণ আদমতো আল্লাহর খলিফা (সূরা-বাকারা, আয়াত-৩০)। যিনি আল্লাহর খলিফা তিনিতো আল্লাহর রসুল। তাই আদম (আঃ) যে প্রক্রিয়ায় নিজেকে ইবলিস থেকে মুক্ত করলেন, অর্থাৎ যে চেহারায় সেজদা দিয়ে আদম নিজে পবিত্র হলেন। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ আদম চেহারায় সেজদা দেওয়ার মধ্যেমেই আদম সন্তানগণও ইবলিস মুক্ত হলেন। কারণ ইবলিস থেকে মুক্তির প্রক্রিয়া বা পবিত্র করণ প্রক্রিয়া সকলের জন্য একই। এটাই আল্লাহর নিয়ম। আর আল্লাহর নিয়মের কোন পরিবর্তন নাই (সূরা-বনি ইস্রাইল, আয়াত-৭৭)। তাই আদম সন্তানগণ আদমকে রসুল জ্ঞানে বিশ্বাস করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দিয়ে ইবলিস থেকে পবিত্র হলেন। এই লক্ষে আল্লাহ বলেন, তোমরা আদমের নিমিত্তে সেজদা কর (সূরা-আরাফ, আয়াত-১১)।
(বিঃদ্রঃ এই বিষয়ে বিস্তারিত এই পুস্তকের আদম সেজদার রহস্য অধ্যয়ে দেখুন) এখানে উল্লেখ্য যে, সুরা আরাফের ২৯নং আয়াতে উল্লেখিত ওয়াজুহাকুম শব্দ দিয়ে নবীদের জন্য নিজের চেহারা বুঝানো হয়েছে আর বনি আদমদের জন্য তাদের নিজেদের রসুলের চেহারা বুঝানো হয়েছে। তবে সেজদার প্রক্রিয়াটা সকলের জন্য একই। অর্থাৎ সেজদার সময় একটি চেহারা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাহলে দেখাগেল বনি আদমগণের ইবলিস থেকে মুক্তি লাভের জন্য একজন রসুল দরকার। এই জন্য আল্লাহ বলেন, আমি মুমিনদের মধ্যে থেকে মুমিনদের নিকট রসুল পাঠাই। যিনি মুমিনদেরকে (ইবলিস) পবিত্র করবেন (সূরা-ইমরান, আয়াত-১৬৪)। এখন যদি কেউ রসুল বাদে অন্য কোন প্রক্রিয়ায় ইবলিস থেকে পবিত্র হয়। তাহলে (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৫১) এবং (সূরা-ইমরান, আয়াত-১৬৪) ব্যর্থ হবে। কিন্তু না আল্লাহর কোন আয়াতকে ব্যর্থ করা যাবে না (সূরা-হুর, আয়াত-২০)। আর যদি কেউ আল্লাহর আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তার জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (সূরা-হজ, আয়াত-৫১)। কাজেই ইবলিস থেকে পবিত্র হতে হলে একমাত্র রসুলই দরকার। রসুল ছাড়া ইবলিস মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। এখানে উল্লেখ্য যে পবিত্রতা হচ্ছে দুই প্রকার।
(১) আত্মিক পবিত্রতা : যেটা হচ্ছে ইবলিস থেকে পবিত্র হওয়া। যেটার প্রক্রিয়া হচ্ছে আদম কাবায় সেজদার মাধ্যমে। আর আদম কাবা বলতে এখানে রসুলকে বুঝানো হয়েছে। তাই আত্মিক পবিত্রতা অর্জিত হবে রসুলের দ্বারা (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৫১)। এই আয়াতে রসুলের মাধ্যমে যে বিষয়ের পবিত্রতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে সেটার আরবী শব্দ হচ্ছে উযাক্কিই। আর উযাক্কিই শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে এমন শত্রু থেকে মুক্ত হওয়া যিনি পশ্চাতে লেগে থাকা গুপ্তচর (আরবী অভিধান পৃষ্ঠা নং-১২৯)। যেহেতু ইবলিস বনি আদমগণের প্রকাশ্য শত্রু (সূরা-বাকারা, আয়াত-২০৮)। আর সেই শত্রু তথা ইবলিস মুক্ত হওয়ার কথাই সুরা বাকারার ১৫১ নং আয়াতে বলা হয়েছে। যেটা অর্জিত হবে একমাত্র রসুলের দ্বারা। অর্থাৎ সেটা হবে সেই কাজটির মাধ্যমে যে কাজটি ইবলিস করে নাই এবং কখনো করবে না। আর সেটাই হচ্ছে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা মাধ্যমে। তাই বনি আদমগণ এই ভাবে আদম কাবায় সেজদার মাধ্যমে ইবলিস মুক্ত হয়ে আত্মিক পবিত্রতা অর্জন করে। (২) আর এক ধরনের পবিত্রতার কথা আয়াতে এসেছে যেটা হচ্ছে শারীরিক পবিত্রতা। যেটা অর্জিত হয় গোসল বা তায়ামুম করার মাধ্যমে যার আরবী হচ্ছে তাহ্হারু। তাহ্হারু শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পানি দ্বারা ধৌত করার মাধ্যমে পবিত্র করা (আরবী অভিধান পৃষ্টা নং-১৬৯৬)। যাহা সুরা মায়েদার ৬নং আয়াতে উল্লেখ্য আসছে যে, সালাতের পূর্বে হাত, পা, মুখ পানি দ্বারা ধৌত করার মাধ্যমে তাহ্হারু অর্থাৎ শারীরিক পবিত্রতা অর্জন কর। এখানে উল্লেখ্য যে যদি কেহ রসুলের কাছে না গিয়ে অর্থাৎ আদম কাবায় সেজদা না দিয়ে শুধু হাত, পা, মুখ পানি দিয়ে আজীবন ধৌত করার মাধ্যমে শারীরিকভাবে পবিত্র থাকে তাহলে সে কখনো আত্মিক পবিত্রতা অর্থাৎ ইবলিস থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে না। আর তাই তাকে আত্মিক পবিত্রতা অর্জন করতে হলে তাকে অবশ্যই রসুল সুরতে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ইবলিস মুক্ত হয়েই তা অর্জন করতে হবে। আর তখনই সে তাকওয়া অর্জনকারী মুমিন বলে গণ্য হয়। আর এই ধরনের তাকওয়া অর্জনকারী কোন ব্যক্তি যখন শয়তানের কুমন্ত্রণা দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন সে তার অন্তরে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার কথা স্বরণ করবে। তখনই সে ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। এবং তাৎক্ষণিকভাবে তার চক্ষু খুলে যাবে (সূরা-আরাফ, আয়াত-২০১)। এজন্য যে ইবলিস তো আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার শামিল হবে না (সূরা-হিজর, আয়াত-৩৩)। এমন এক শ্রেণী লোক আছে যারা মনে করে যে, আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইলেই আমরা ইবলিস থেকে মুক্ত হবো। কিন্তু না। ইবলিস মুক্তির জন্য আল্লাহর নির্দেশিত উপরোক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। তা না করে যদি কেহ মনে করে মৌখিকভাবেই নিজের চেষ্টায় অর্থাৎ রসূল ব্যতীত ইবলিস মুক্ত হওয়া যাবে সেটা তাদের অজ্ঞতার শামিল হবে। আল্লাহ বলেন তোমরা অজ্ঞদেরকে পরিহার কর (সূরা-আরাফ, আয়াত-১৯৯)। ইবলিস মুক্তির জন্য যার যার গুরু তার তার রসুল। আর সেই রসুল কাবায় আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ইবলিস মুক্ত হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। যার কোন গুরু নাই অর্থাৎ যার কোন রসুল নাই সে ইবলিস মুক্ত হতে পারবে না। বিধায় তার অন্তকরণ বিশুদ্ধ নয়। তাই সে দিন সে পরিত্রাণ পানে না (সূরা-শুয়ারা, আয়াত-৮৯)। তাই ইবাদতের পূর্ব শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন করা। যিনি একখনো ইবলিস মুক্ত হয়ে পবিত্রতা অর্জন করতে পারে নি তার ইবাদৎ-বন্দেগী কোন কাজে আসবে না। বরং তারা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন তাদের মন ইবলিস দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে সালাতে তাদের মন স্থির থাকে না। বিধায় সালাতে তারা একনিষ্ঠ হতে পারে না। ফলে সালাত তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায় (সূরা-বাকারা, আয়াত-৪৫ ও ৪৬)। ফলে তারা সালাতে উদাসীন থাকে। আর আল্লাহ এ ধরনের সালাতীদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন (সূরা-মাউন, আয়াত-৬)। কাজেই ইবলিস মুক্ত পবিত্রতা অর্জন করা বনি আদমের জন্য অতিব জরুরী বিষয়। অতএব সম্যক গুরু তথা রসুলের সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ইবলিস মুক্ত হয়ে আত্মিক পবিত্রতা অর্জনকরা ছাড়া মানব মুক্তির আর কোন পথ নেই।

ইবলিশের অনুসারীদের ধর্ম বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষামূলক আলোচনা

আলোচনা নং-১ : আদমকাবায় সেজদা সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন।

নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি নাযিলকৃত সকল ওহী এই কুরআনোর মধ্যে। কুরআনের বাহিরে কোন ওহী নেই, আবার কুরআনের মধ্যে ওহী ব্যতিত অন্য কোন কথা নেই বিধায় এই কুরআন নির্ভুল এতে কোন সন্দেহ নেই (বাকারা-১)। আর এই কুরআন দ্বীনের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ (মায়েদা-৩)। যারা কুরআন অনুসরণ করে তাহারাই নবীর অনুসারী। কারণ নবী (স) ওহী ব্যতীত কোনকিছু অনুসরণ করে নাই (আনআম-৫০)। আর তিনি ওহী ব্যতিত কাউকে সতর্ক করে নাই (আম্বিয়া-৪৫)। পৃথিবীতে দুইটি দল। একটি দল হচ্ছে কুরআনের অনুসারী, অপরটি হচ্ছে ইবলিশের অনুসারী। ইবলিশ একমাত্র আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (বাকারা-৩৪)। তাই যারা সম্যক গুরু তথা রসূল কাবায় তথা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে না, উহারাই ইবলিশের অনুসারী, কাফের। আর যারা রসূল কাবায় তথা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে উহারাই কুরআনের অনুসারী মমিন। আর উহারাই জান্নাতে যাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, যদি কেহ আদম কাবায় সেজদা না দিয়ে জান্নাতে যায়। তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থন করে সেদিন ইবলিশ আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করবে (সূরা কাফ-২৮) যে, আদম কাবায় সেজদা না করে আমি যদি জান্নাত থেকে বহিস্কার হই (তাহা-১২৩) (বাকারা-৩৪), তাহলে যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে নাই তারা কিভাবে জান্নাতে যাবে? তখন ইবলিশ আরও বলবে যদি তাদেরকে জান্নাতে দাও তাহলে আমাকেও জান্নাতে দিতে হবে। যেহেতু ইবলিশ জান্নাতে যেতে পারবে না নিশ্চিত। তাহলে যারা আদমকাবাই সেজদাকারী নহে তারাও জান্নাতে যেতে পারবে না এটাও নিশ্চিত। যে কাজ করলে ইবলিশের কাছে আল্লাহ প্রশ্নবিদ্ধ হবে এমন বিচার আল্লাহ করবে না বিধায় যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী নহে, তারা যতই এবাদতই করুক না কেন তারা জান্নাতে যেতে পারবে না এটা নিশ্চিত। কারণ আল্লাহর পায়ে সেজদার মাধ্যমেই সেদিন ইমান পরীক্ষা করা হবে (কালাম-৪২)। আবার যদি সম্যক গুরু তথা রাসুল কাবায় তথা আদম কাবায় আল্লাকে সেজদা করার কারণে যদি আল্লাহ কাউকে জাহান্নামে দেয় তাহলে তারা আল্লাহর কাছে এমনটি বলবে যে, আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দেওয়ার কারণে যদি আমরা জাহান্নামে যাই তাহলে আদম কাবায় আল্লাকে সেজদাকারী ফেরেস্তাগণ কিভাবে জান্নাতে থাকে। হয় ফেরেস্তাদের বেহেস্তে থেকে বাহির করুন তা-নাহলে আমাদেরকে বেহেস্তে দিন। কারণ আমরা তো উভয় আদমকাবায় সেজদাকারীর দল। যেহেতু ফেরেস্তারা বেহেস্তে থাকবে এটা নিশ্চিত তাই আদমকাবায় সেজদাকারী সকলেই জান্নাতে যাবে এটা নিশ্চিত। তাহা না হলে আল্লাহর বিচার ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বিধায় আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী কেহ জাহান্নামে যাবে না এটা নিশ্চিত। আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদাকারীগণ যদি দোযখে যায়, তবে ঐ সেজদা গ্রহণকারীগণও দোযখী হবে। এক্ষেত্রে আদম (আঃ) ও ইউসুফ (আঃ) যেহেতু সেজদা গ্রহণকারী তাহলে উহারাও দোযখী হওয়ার কথা। যেহেতু উহারা দোযখী হবে না, তা হলে আদম সেজদাকারীগণ কেহ দোযখী হবে না এটা নিশ্চিত। এখানে উল্লেখ্য যে, ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীগণ আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার শামিল হবে না (হিযর-৩৩)। অথচ উহারা ধারণা, কল্পনা ও অনুমানের ভিত্তিতে আল্লাহকে সেজদা করে (রাদ-১৫) এবং একই ভাবে অর্থাৎ অনুমানে তারা আল্লাহতে আত্মসমর্পন করে (ইমরান-৮৩)। তাদের এই অনুমানের সেজদা ও অনুমানে সেজদার মাধ্যমে আল্লাতে আত্মসমর্পন গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ সত্য সম্পর্কে তথা আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা বা কল্পনা বা অনুমান মোটেই ফলপ্রসু নহে (ইউনুস-৩৬)। উহারা বলে আমরা আল্লাহ ও রসূলে বিশ্বাস করি এবং উহাদের আনুগত্য স্বীকার করি (নূর-৪৭)। তারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে অথচ উহারা মমিন নহে (বাকারা-৮)। ইবলিশ আল্লাহকে প্রভু বলে (হিযর-৩৬)। তারা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে (হাদিদ-১)। ইবলিশ পুনরুত্থান দিবসও বিশ্বাস করে (সাদ-৭৯) এব সে জান্নাত ও জাহান্নাম বিশ্বাস করে, কারণ তাকেতো জান্নাত থেকেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছে (ত্বাহা-১২৩) (বাকারা-৩৪ হিজর-৩৪)। সে তো ফেরেস্তাগণও বিশ্ব^াস করে। কারণ তাকে তো ফেরেস্তাদের সাথে আদমকে সেজদার জন্য হুকুম করা হয়েছিল (হিযর-২৯)। ইবলিশের অনুসারীগণ লোক দেখানো সালাত আদায় করে (মাউন-৬)। যেহেতু ইবলিশ জ্বীন জাতীয়, (ক্বাহফ-৫০)্ সেহেতু সে আল্লাহর ইবাদত করে। কারণ ইবাদতের উদ্দেশ্যেই আল্লাহর জ্বীন ও ইনসান তৈরী করেছেন (জারিয়া-৫৬)। সেহেতু ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীগণ ইবাদতকারীও বটে। এত কিছু করার পরও ইবলিশ একমাত্র আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা না দিয়েই কাফের (বাকারা-৩৪)। ঠিক একই ভাবে বর্তমানে যারা উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় সকল বিশ্বাস ও কর্মগুলি করে কিন্তু আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে না, বিধায় তাহারা ইবলিশের অনুসারী বলে গণ্য। এই মর্মে আল্লাহর বলে, 'হে মমিন তোমরা আত্মসমর্পনে দাখিল হও পরিপূর্ণভাবে এ বিষয়ে ইবলিশের অনুসরণ করোনা' (বাকারা-২০৮)। এরা এই সেজদা সম্পর্কে মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি করে বলে, আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দেওয়া নাকি শেরেক। তাদের এই কথা ঠিক নহে। কারণ এই সেজদা শেরেক মর্মে কোন আয়াত কুরআনে আসে নাই। তাছাড়া যখন ইবলিশকে বলা হইল, তুমি কেন আদম কাবায় সেজদার শামিল হইলে না? (হিযর-৩২) তখন কিন্তু ইবলিশ এই সেজদা শেরেক মর্মে কোন উক্তি করে নাই। যদি এই সেজদাকে শেরেক বলার কোন অবকাশ থাকত তাহলে ইবলিশ এ সেজদা শেরেক বলে পরিত্রাণ পেয়ে যেত। এতে প্রমাণ হয় যে, এই সেজদা দেওয়া শেরেক নয়। এই সেজদা এইজন্য শেরেক ছিলনা যে, যখন উহাতে আল্লাহর নিজ রুহ প্রবিষ্ট হয়েছিল তখন সেজদার হুকুম করা হয়েছি (হিযর-২৯) বিধায় আদমকে কেবলা করে আল্লাহর রুহুকেই সেজদা দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর নিজ আকৃতির অনুকরণে আদম তৈরী করা হয়েছিল (ত্বিন-৪) (ইনফিতর-৮) (রুম-৩০)। তাই আদম সুরতে আদমকে সেজদা করে নাই বরং আল্লাহর সুরতেই সেজদা করেছে বিধায় এই সেজদা শেরেক ছিলনা। এই সেজদা শেরেক না হওয়ার অপর কারণটি ছিল, আদম আল্লাহর খলিফা (বাকারা-৩০)। অতএব আদমকে সেজদা করে নাই বরং আল্লাহর খলিফাকে কেবলা করে আল্লাহকেই সেজদা করেছে। বিধায় এই সেজদা শেরেক নহে, কারণ এটাতো আল্লাহরই হুকুম। (আরাফ-১১) বরং আদম কাবাই হচ্ছে আল্লাহকে সেজদা দেওয়ার একমাত্র ঠিকানা। (আরাফ-১১) পবিত্র কুরআন অনুসন্ধান করে দেখা গেছে একমাত্র আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার নির্দেশ ছাড়া আর কোন ঠিকানায় সেজদার নির্দেশ আল্লাহ করে নাই। তবে শুধুমাত্র আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বলা হয়েছে, 'ওয়াসযুদু লি আদামা' অর্থ আদমের নিমিত্তে সেজদা কর। (আরাফ-১১)। অনেকেই বলে মাকাতে ইব্রাহিমকে অর্থাৎ কাবাঘরকে সেজদার স্থান হিসাবে নির্দিষ্ট করতে বলা হয়েছে, কিন্তু না, কুরআনে এমনটি বলা হয় নাই, যদি বলা হইত তাহলে কুরআনে 'ওয়াসযুদুলি মাকামে ইব্রাহিম' আয়াত আসত, কিংবা 'ওয়াসযুদু লি বায়তুল্লাহ' আয়াত আসত, কিংবা ওয়াসযুদু লি হেরেমশরীফ' আয়াত আসত। কিন্তু এমনটি আয়াত আসে নাই। তবে আয়াতে এসেছে 'আত্তাখিজু মিন মাকামে ইব্রাহিম মু-উসাল্লি' (বাকারা-১২৫) এই আয়াতে আত্তাখিজু শব্দের অর্থ হচ্ছে সাবস্ত্য করা বা বানাইয়া লওয়া (আরবী অভিধান পৃ. ২৩)। আয়াতের অর্থ হচ্ছে, মাকাকে ইব্রাহিমকে উসাল্লি আদায় করার স্থান সাবস্ত্য কর। (বাকারা-১২৫) তবে এই আয়াতে উসাল্লি শব্দ এসেছে। আর উসাল্লি শব্দের অর্থ হচ্ছে উত্তম প্রশংসা করা (আরবী অভিধান পৃ. নং-১৬০৭) অনেকে উসাল্লি শব্দকে সালাত অর্থে ব্যবহার করে, কিন্ত না, উসাল্লি ও সালাত এক শব্দ নহে। উসাল্লি ও সালাতের মধ্যে একটি সূক্ষè পার্থক্য আছে, আর সেটা হচ্ছে উসাল্লি এর মধ্যে সেজদা নেই। কারণ আল্লাহ বান্দার জন্য উসাল্লি আদায় করে (আহযাব-৪৩)। আর সালাত হচ্ছে উপাসনামূলক শব্দ বা প্রার্থনা বা উপাসনা (আরবী অভিধান পৃ. নং-১৬০৩)। সালাতের ভিতরে সেজদা ফরজ (নেসা-১০২)। যেহেতু মাকামে ইব্রাহিম উসাল্লি আদায় করার স্থান (বাকারা-১২৫) আর উসাল্লি আদায়ের জন্য সেজদা করা জরুরী নহে। বিধায় মাকামে ইব্রাহিম সেজদার লক্ষ্যবস্তু নহে, তবে মমিনদের উপাসনার সময় মুখ ফিরানোর কাবা অর্থাৎ বাহ্যিক কাবা হচ্ছে মাসজিদুল হারাম শরীফ (বাকারা-১৪৪)। যেখানে মাকামে ইব্রাহিমের অবস্থান। তবে এটা সেজদার লক্ষ্যবস্তু নহে। তারপরও এক শ্রেণীর মানুষ আছে তারা প্রকৃত মমিন না হয়ে সরাসরি বাহ্যিক কাবায় সেজদা করে। ফলে সেজদার সময় কাবাঘরের কাল্পনিক ছবি তার মস্তিষ্কে উদয় হয়। তখন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কাবাঘরের কাল্পনিক ছবি এসে যায়। ফলে ঐ সেজদা আল্লাহ পর্যন্ত পৌছানোর ক্ষেত্রে কাবাঘরের কাল্পনিক ছবিটি অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। বিধায় সেজদাকারী আল্লাহর নৈকট্য লাভে ব্যর্থ হয়। অথচ সেজদাই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার একমাত্র উপায়। এইমর্মে আল্লাহ বলেন, 'সেজদা কর এবং আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও' (আলাক-১৯)। অতএব, আল্লাহর নিকটবর্তী হতে হলে সেজদার সময় কাবাঘরের কাল্পনিক ছবি মস্তিষ্ক থেকে দূরীভূত করা প্রয়োজন। সেজদার সময় আল্লাহ ও বান্দার মাঝে যে সকল কাল্পনিক ছবি ও বিষয় রাশিগুলির কাল্পনিক ছবি অন্তরায় হয়ে দাড়ায় তাহা দূরীভূত করতে পারলেই আল্লাহর নৈকট্য সহজ হয়ে যায়। কারণ আল্লাহ বান্দার এতটাই কাছে যে, মানুষ ও তার অন্তরের কাছাকাছি আল্লাহ অবস্থান করেন (আনফাল-২৪)। এখানে উল্লেখ্য যে, মানুষ যখন কোনকিছু কল্পনা করে তখন তার মস্তিষ্কে সেই বিষয়ে একটি কাল্পনিক রূপ বা মূর্তি অঙ্কিত হয়, তদ্রুপভাবে আপনি যখন জানতে পারলেন যে, আল্লাহ আরশে আজিমে সমাশিন আছেন (সেজদা-৪) এবং মুত্যুর পর আপনাকে আল্লাহর সম্মুখে প্রত্যানীত করা হবে (আনআম-৩৬) এমনটি কল্পনা করার পর তখন আপনার মস্তিষ্কে আল্লাহ সম্পর্কে একটা কাল্পনিক মূর্তি অঙ্কিত হয়ে গেল, আর সেই কাল্পনিক মূর্তি মস্তিষ্কে ধারণ করা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা আরোপ করার শামিল হবে, কারণ আপনি আল্লাহ সম্পর্কে যেমনটি কল্পনা করেছেন, আল্লাহত তেমনটি নহে। আর আল্লাহ সম্পর্কে যারা মিথ্যারোপ করে উহারাই বড় জালিম (হুদ-১৮)। আবার আল্লাহ সম্পর্কে কাল্পনিক মূর্তি, যেটা আপনি মস্তিষ্কে ধারণ করেছেন, সেটা আল্লাহ সম্পর্কে একটি মেসেল বা উপমার সামিল আর আল্লাহ সম্পর্কে উপমা বা মেসেল গ্রহণযোগ্য নহে (নহল-৭৪)্ কাজেই আল্লাহ সম্পর্কে কাল্পনিক মূর্তি মস্তিষ্ক থেকে দূরীভূত করা প্রয়োজন। কেননা সত্য সম্পর্কে ধারণা, কল্পনা বা অনুমান মোটেও ফলপ্রসূ নহে (ইউনুস-৩৬)। তাহলে দেখা গেল বাহ্যিক কাবাঘরের কাল্পনিক ছবি কিংবা আল্লাহ সম্পর্কে কাল্পনিক মূর্তি কিংবা জাগতিক বিষয়রাশির কাল্পনিক মূর্তি মস্তিষ্কে ধারণ করে সেজদা দেওয়া শেরেক বলে গণ্য হবে। যেমনভাবে মূর্তি পূজা শেরেক। তেমনি ঈদগাহ কিংবা ইট পাথরে তৈরি কোন বস্তুকে যদি কেহ সেজদার ঠিকানা সাব্যস্ত করে সেজদা করে তাহলে সেটা শেরেক হবে। কারণ সেজদার মালিক একমাত্র আল্লাহ (জ্বিন-১৮) (হামিম-৩৭)। তাই আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সেজদার সময় যাবতীয় কাল্পনিক ছবি দূরীভূত করা অতীব জরুরী বিধায় আদম কাবায় তথা রসূল সূরতে যখন সে আল্লাহকে সেজদা করে তখন তার অন্তরে স্বীয় রসূল সূরতে আল্লাহর সায়ের উদয় হয়। ফলে বাহ্যিক কাবাঘরের সেই কাল্পনিক ছবি কিংবা আল্লাহ সম্পর্কে কাল্পনিক মূর্তি, কিংবা জাগতিক বিষয়রাশির কাল্পনিক মূতি মস্তিষ্ক থেকে দূরীভূত হয়ে তার মন মস্তিষ্কে একমাত্র রসূল সূরতে আল্লাহর সায়ের বা চেহারা স্থান লাভ করে আর তখন সে যাবতীয় কাল্পনিক শেরেক থেকে মুক্তি লাভ করে। তখন সে আর মুশরিকদের দলভূক্ত থাকে না। অর্থাৎ শেরেক থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে উপাসনার ক্ষেত্রে আল্লাহর চেহারা যাজন করা। যাহারা উপসনায় আল্লাহর চেহারা যাজন করে তারা মুশরিকদের দলভূক্ত নহে (আনআম-৭৯)। সে ক্ষেত্রে মমিনদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, 'প্রত্যেক সেজদায় তোমাদের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর' (আরাফ-২৯)। এই আয়াতে নবীদের জন্য নিজের চেহারায় সেজদা, আর ভক্তদের জন্য রসূল চেহারায় সেজদা করতে বলা হয়েছে। এই আয়াত অনুসারে জানাগেল প্রত্যেক মমিনই সেজদার সময় একটি চেহারা যাজন করে। এইলক্ষে আল্লাহ বলেন, 'প্রত্যেকের একটি কেবলা স্বরূপ চেহারা আছে, যেদিকে সে প্রত্যাবর্তন করে' (বাকারা-১৪৮)। এই আয়াতে 'অজহা' শব্দ এসেছে 'অজহা' শব্দের অর্থ হচ্ছে চেহারা। (আরবী অভিধান পৃ. নং-২৫২৮)। অভিধান দিশারী পৃ. নং-২৭)। এইভাবে চেহারা যাজনের মাধ্যমে আল্লাতে আত্মসমর্পন করার কথা বলা হয়েছে (বাকারা-১১২) (ইমরান-২০)। উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেল, যারা প্রভুর উপাসনায় অন্তরে কোন চেহারা যাজন করেনা উহারা হয় মুশরিক না হয় কাফের। প্রভুর নৈকট্য লাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে শেরেক থেকে মুক্তি লাভ করা।
অতএব, আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দিয়ে শেরেককে দূরীভূত করে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করাই হচ্ছে সিরাতুল মুস্তাকিম। আর তাই আল্লাহ বলেন, 'ইহাই আমা পর্যন্ত পৌঁছানোর সিরাতুল মুস্তাকিম। (হিযর-৪১)। আর ইবলিশ বলল আমি এই সেরাতুল মোস্তাকিমে বসিয়া থাকিব এবং আমি যেভাবে বিভ্রান্তি হয়েছি সেইভাবে সকলকে পথভ্রষ্ট করিব (আরাফ-১৬)। আল্লাহ বলেন, 'ওয়াস যুদুলী আদাম', অর্থাৎ আদমের নিমিত্তে সেজদা কর (আরাফ-১১)। কিন্তু যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা না দিয়ে কাল্পনিক শেরেকে নিমজ্জিত আছেন তাদেরকে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, 'শেরেক সবচেয়ে বড় জুলুম' (লোকমান-১৩) আর আল্লাহ বলেন, 'তোমাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করোনা' (আনআম-৮২)। অতএব, শেরেক করলে তার ঈমান কলুষিত হয়। আর শেরেক করলে কর্ম বিনষ্ট হবে। (জুমার-৬৫)। আর শেরেকের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না (নেসা-৪৮)।
অতএব, এইভাবে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করা শেরেক নয় এটা নিশ্চিত বরং এই প্রক্রিয়ায় আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দেওয়াই শেরেক মুক্তির একমাত্র উপায়। তার পরও তারা এই সেজদা সম্পর্কে মানুষকে আরো বিভ্রান্তি করে এই ভাবে যে, এই সেজদার হুকুম শুধু ফেরেস্তাদের জন্য ছিল, এটা অন্য কারো জন্য প্রযোজ্য নহে। তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ ইবলিশ তো ফেরেস্তা নহে, সে তো জ্বীন জাতীয় (কাহফ-৫০)। ইবলিশ জ্বীন হওয়া সত্ত্বেও যখন আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা না দিয়েই কাফের, তাতে প্রমাণ হয়, এই সেজদা শুধু ফেরেশতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জ্বীনদের জন্য আদমকাবায় সেজদা প্রযোজ্য ছিল। যেমন দরুন শিক্ষক ছাত্রদের ব্যবহারিক ক্লাসে বলিল, হে ছাত্রগণ তোমরা এক অনু অক্সিজেন এবং দুই অনু হাইড্রোজেনের বিক্রিয়া ঘটিয়ে এক অনু পানি তৈরী কর। তাই বলে পানি তৈরির এই ফর্মূল া শুধু ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন নহে বরং উহা সকলের জন্য প্রযোজ্য হবে। ঠিক তদরূপ যদিও ফেরেস্তাদের উদ্দেশ্যে আদমকে সেজদা দিতে বলেছে তারপরও এই সেজদার কার্যকারিতা শুধু ফেরেস্তাাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং বণিআদমদের জন্য প্রযোজ্য হবে বিধায় ইউসুফ (আঃ)কে সেজদা দিল তাঁর ১১ ভাই (সুরা ইউসুফ আয়াত নং-১০০)। এখনে উল্লেখ্য যে, মা হাওয়া বেহেস্তের মধ্যে ফেরেস্তাদের সাথে আদম (আ:)কে সেজদা করেছে (সূরা বাকারা-৩৪ এবং ৩৫নং আয়াত) (বি: দ্র: আদম সেজদার রহস্য অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন)। আদম যখন তার প্রভুকে সেজদা দিতে আদেশপ্রাপ্ত হইল তখন এই লক্ষ্যে আল্লাহ বলেন 'প্রত্যেক সেজদায় তোমাদের (স্মৃতিপটে) চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর' (আরাফ-২৯)। উক্ত আয়াত অনুসারে আদম স্ব-রূপে সেজদার মাধ্যমে নিজেই আদম কাবায় সেজদার শামিল হইল। আর পরবর্তী মুমিনের জন্য রসূল সূরতে সেজদার বিধান চালু হইল।
এতে প্রমাণ হয় যে, আদম কাবায় সেজদা শুধু ফেরেশতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সকলের জন্য ঐ সেজদা প্রযোজ্য। আদম কাবায় সেজদার মাধ্যমে আল্লাতে আত্মসমর্পন করাই হচ্ছে মুসলমান হওয়ার ফর্মূলা। সেই অনুসারে ইউসুফ (আঃ) এর ১১ ভাই মুসলমান হওয়ার সময় ইউসুফ (আঃ)কে কেবলা করে আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে মুসলমান হয়েছিল (ইউসুফ- আয়াত নং ১০০)। তার পরও ইবলিশের অনুসারীগণ এই সেজদা থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য এমনটি বলে যে, আদম সেজদার ঐসকল আয়াতগুলি রহিত হইয়া গিয়াছে। তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত কোন আয়াতকে রহিত করা হয় নাই (বাকারা-১০৬) বরং পূর্বের ওহিকে আরো পরিষ্কার ভাবে এই কোরআনে বর্ণনা এসেছে (বাকারা-১০৬)। তার পরও বর্তমানে ইবলিশের অনুসারীগণ মানুষকে এই সেজদা থেকে বিরত রাখার জন্য এমনটি বলে থাকে যে, আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার নিয়ম, আদম (আঃ) হতে ইউসুফ (আঃ) পর্যন্ত চালু ছিল। আমাদের নবীর ক্ষেত্রে আদম কাবায় সেজদার নিয়ম পরিবর্তিত হয়ে অনুমানে আল্লাহকে সেজদা দিলেই হবে। কিন্তু কথাটা ঠিক নহে, কারণ এই মর্মে আল্লাহ, নবী (সঃ) কে বলেন 'তোমার পূর্বে যে সকল রসূল ছিল, তাদের ক্ষেত্রে যেমন নিয়ম ছিল তোমার ক্ষেত্রেও তাই, আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন নাই' (বনি ইসরাইল-৭৭) ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীগণ বিভিন্ন ভাবে বিভ্রান্তি করে মানুষকে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে কিংবা বাধা দিয়ে থাক্ েকারণ 'ইবলিশ তো মানুষকে এই সেজদা দিতে বাধা দিয়ে থাকে (সূরা নামল-২৫)। কাজেই ইবলিশের দলকে পরিহার করে একজন সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ইবলিশ থেকে পবিত্র হয়ে নবীর অনুসারী, তথা আল্লাহর দলভুক্ত হলেই, আল্লাহ তাকে ঈমানের অনুমতি দিবেন। কারণ আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত, কেহ ঈমান অর্জন করিতে পারিবে না। (ইউনুছ-১০০) তাহলে দেখা গেল আদম কাবায় আল্লাহকে যারা সেজদা করে নাই, উহারা ইবলিশের অনুসারী, অর্থাৎ ইবলিশের দলভুক্ত বিধায় তাদেরকে আল্লাহ ঈমানের অনুমতি দিবেন না। ফলে তারা মমিন হতে পারবে না। তাহলে দেখা গেল মমিন হতে হলে আল্লাহর অনুমতি দরকার, আল্লাহর অনুমতি পেতে হলে আল্লাহর দলভুক্ত হওয়া দরকার, আর আল্লাহর দলভুক্ত হতে হলে ইবলিশের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা দরকার, আর ইবলিশের অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে হলে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দেওয়া দরকার। এই ভাবে যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দিয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈমানের অনুমতি লাভ করে নাই তারা মমিন নহে। আর যিনি মমিন নহেন তিনি ক্ষতির ভিতর আছেন। (আছর-১)। আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে এইভাবে যে, মুত্যুর পর যখন আল্লাহর কাছে নিয়ে গিয়ে আদম আকৃতি বিশিষ্ট আল্লাহর পায়ে সেজদা দিতে বলা হবে তখন তারা সেজদা দিতে সক্ষম হবে না (কালাম-৪২)। কারণ তাহারা যখন নিরাপদ ছিল তখন তাদের আহবান করা হয়েছি সেজদা দিতে তারা করে নাই (কালাম-৪৩)। এইজন্য আল্লাহ বলেন এই দিবস আসার পূর্বেই আল্লাহর আহবানে সাড়া দাও। (সূরা শুরা-৪৭)। অতএব যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী নহে উহারা সূরা আরাফের ১১ নং আয়াতটি অমান্যকারী। আর কোরআনের একটি আয়াত অমান্যকারী কাফির বলে গণ্য। যারা আদম কাবায় আল্লাকে সেজদা করে না উহারা ইবলিসের অনুসারী। এদেরকে বর্জন করে সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দিয়েই প্রকৃত মুমিন হওয়া দরকার।

আলোচনা-২ : আল্লাহ বিশ্বাস ও রসূল বিশ্বাস সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন

অনেকেই বলে আল্লাহর কোন আকৃতি নেই, অথচ কোরআনে এই মর্মে কোন আয়াত আসে নাই। বরং আকৃতি সম্পর্কে আয়াত আছে, যেমন সূরা ছাদ এর ৭৫ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর হাত আছে, এবং সূরা কালামের ৪২ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর পা আছে। সূরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর চেহারা ধ্বংসশীল নহে। সূরা সেজদার ৪ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, ৬ দিনে পৃথিবী তৈরি করে আল্লাহ আরশে বসিলেন। তাহলে দেখা গেল যেখানে দাঁড়ানো এবং বসা উল্লেখ আসছে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহর দেহ বা আকৃতি আছে বলে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কোন কথা বলা যাবে না। (আরাফ-৩৩) এরা আল্লাহ সম্পর্কে মানুষকে এই ভাবে বিভ্রান্তি করে যে, আল্লাহ গায়েব, কিন্তু না, সূরা আরাফের ৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ গায়েব নহে। আল্লাহ লা-উরাই বা গাইর মুরাই বা অদৃশ্য এমন আয়াত পবিত্র কোরআনে নাই। এরা আল্লাহ সম্পর্কে মানুষকে এইভাবে বিভ্রান্তি করে বলে যে, মুসা (আঃ) নবী হয়েই আল্লাহকে দেখতে পারে নাই (আরাফ-১৪৩) তাহলে সাধারণ মানুষ কিভাবে আল্লাহকে দেখবে? তাই ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ অসম্ভব। কিন্ত না, তাদের এই কথা ঠিক নয়, কারণ এই যে, মুসা (আঃ) তাজাল্লিময় রূপে আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিল (আরাফ-১৪৩)। তাই মূসাকে আল্লাহ বলেছিল 'তুমি আমাকে তাজাল্লিময় রূপে দেখতে পাবে না' (আরাফ-১৪৩)। আর তাই আল্লাহ মানুষের সাথে হেযাব বা ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া কথা বলিয়া থাকেন (শুরা-৫১) আর তাই মুসার সাথে তুর পাহাড়ে স্বরূপের হেযাব বা ছদ্মদেশ ধারণ করে সাক্ষাৎ দিয়েছিল (বি. দ্র. এই পুস্তকের মুসার আল্লাহর দর্শন অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন)। তার পরও যারা মুসার সাথে আল্লাহর সাক্ষতের বিষয় সন্দেহ পোষণ করে তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য আল্লাহ বলেন, মুসার সাথে আল্লাহর সাক্ষাতের বিষয়ে তুমি সন্দেহ করিওনা (সেজদা-২৩)। একই ভাবে নবী মুহাম্মদ (সঃ) নিজ আকৃতিতে আল্লাহর দর্শন লাভ করেছিলেন (নাযম-৬)। আল্লাহর রুহ মরিয়মের সাথে মানব আকৃতি ধারণ করে সাক্ষাৎ দিয়েছিলেন (মরিয়ম-১৭)। এ সকল আয়াত থেকে জানা গেল, ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভব। আল্লাহ এই মর্মে আরোও বলেন, হে মানুষ তুমি কঠোর সাধনা কর, অতঃপর আল্লাহর সাক্ষাৎ পাবে। (ইনশিকাক-৬) অনেকেই বলে এই আয়াতে মুত্যুর পরের সাক্ষাতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু না, তাদের এ কথা ঠিক নয়, কারণ মৃত্যু পর সেদিন কাফেররাও আল্লাহকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে (মরিয়ম-৩৮)। কিন্তু সেদিনের সেই তাৎক্ষণিক বিশ্বাস আনয়ন কবুল করা হবে না (আনআম-১৫৮)। অতএব, কঠোর সাধনার মাধ্যমে যে সাক্ষাৎ লাভের কথা বলা হয়েছে, সেটা অবশ্যই ইহকালেই আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করতে হবে। অতএব, কাহারো কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে উপরোক্ত আলোচনা মতে আকৃতিগতভাবে আল্লাহ বিশ্বাসের মাধ্যমে ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্পর্কে বিশ্বাস করাই কুরআন মাফিক আল্লাহ বিশ্বাস।
এরা রসূল সম্পর্কে মানুষকে এই ভাবে আরোও বিভান্তি করে বলে যে, আমাদের ভিতরে এখন কোন রসূল নাই, রসূল শেষ, কিন্তু না, রসূল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক। রসূল উপস্থিত আর তাই রসূলের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে (নূর-৫৪)। পক্ষান্তরে নবী শেষ (আহযাব-৪০)। অর্থাৎ নবী অনুপস্থিত, আর তাই নবীর আনুগত্য করার কথা কুরআনে বলা হয় নাই। কারণ অনুপস্থিত ব্যক্তির আনুগত্য করা সম্ভব নয়। এতে প্রমাণ হয় যে, রসূল উপস্থিত আর নবী অনুপস্থিত। আর তাই আল্লাহ বলেন, রসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শান্তি দেই না, (বনি ইসরাইল-১৫)। প্রত্যেক উম্মতের কাছে আল্লাহ রসূল পাঠায় (ইউনুস-৪৭)। এজন্য আল্লাহ সেদিন প্রশ্ন করবে, তোমাদের ভিতর রসূল উপস্থিত থাকার পরও তোমরা কিভাবে কাফের হইলে? (ইমরান-১০১)। সেদিন ফেরেস্তারা সাক্ষ্য দিবে যে, তাদের ভিতরে রসূল উপস্থিত ছিল (নহল-১১৩)। সেদিন কাফেরাও স্বীকার করিবে, তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে রসূল উপস্থিত হয়েছিল (জুমার-৭১)। কোরানের আয়াত আবৃত্তির করার জন্য প্রত্যেক জনপদে 'রসুল পাঠাই (সুরা কাসাস-৫৯) (বি: দ্র: রসুল অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন) যারা বলেন বর্তমানে রসূল নাই, তাদের এ কথা সত্য হলে উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিংবা ব্যর্থ হবে, কিন্তু না, আল্লাহর কোন আয়াত ব্যর্থ হবে না। বিধায় রসূল বর্তমান আছে, এতে কোন সন্দেহ নাই। এখানে উল্লেখ্য যে, নবী শেষ (আহযাব-৪০) কিন্তু রসূল শেষ এমন কোন আয়াত কোরআনে নেই। তারপরও অনেকেই তর্ক করে বলেন নবী ও রসূল একই পদ। নবী শেষ অর্থাৎ রসূলও শেষ, কিন্তু না, তাদের কথা ঠিক নহে, কারণ নবী ও রসূল এক পদ নহে। নবী ও রসূল দুইটি পদ, দুইটি শব্দ, দুইটি আয়াত্ এখন যদি কেউ রসূল শব্দকে নবী অর্থে ব্যবহার করে কিংবা নবী শব্দকে রসূল অর্থে ব্যবহার করে তাহলে পরস্পরের ভিতরে একটি শব্দের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে বিধায় আল্লাহর আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার আশংকা থেকে যায়। কিন্তু আল্লাহ পাকের কোন আয়াত ব্যর্থ হবেনা। (হুদ-২০)। তারপরও যারা আল্লাহর আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি, জাহান্নাম (হজ্ব-৫১)। কাজেই নবী ও রসূল এক পদ বলা থেকে বিরত থাকা উত্তম। এখানে উল্লেখ্য যে, যাকে নবুয়ত দেয়া হয় তাকে নবী বলে, আর যাকে রেসালাতের ভার দেওয়া হয় তাকে রসূল বলে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক নবীকে নবুয়ত দেয়া হয়েছে (ইমরান-৭৯)। প্রত্যেক নবীর উপরে ওহি নাজিল হয়েছে (নেসা-১৬৩) প্রত্যেক নবীর উপর কিতাব দেওয়া হয়েছে (ইমরান-৮১) প্রত্যেক নবীর উপরে রেসালাত দেওয়া হয়েছে (জ্বীন-২৩)্ তাহলে দেখা গেল প্রত্যেক নবীর উপর দুইটি পদ, একটি নবী পদ, অপরটি রসূল পদ। এই জন্য নবীদের ভিতরে কোন পার্থক্য নেই (বারারা-১৩৬) প্রত্যেক নবীই রসূল পক্ষান্তরে রসূলদের মধ্যে পার্থক্য আছে (বাকারা-২৫৩) অর্থাৎ রসূল হচ্ছে দুই প্রকার, একটি হচ্ছে নবুয়ত প্রাপ্ত বা ওহি প্রাপ্ত রসূল, অপরটি হচ্ছে নবুয়ত ব্যতিত কিংবা ওহি ব্যতিত রসূল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন "মা-আরছালনা মিন কাবলিকা মিনাররাসূলি ওয়া-লা-নাবীই" (হজ্ব-৫২)। (এখানে 'মা' শন্দের অর্থ নাসূচক অথবা প্রশ্নবোধক (আঃ অভিঃ পৃ. ২১৯৩) আরছালনা- অর্থ আমি পাঠাইয়াছি (আঃ অভিঃ পৃ.১৯১৮) মিনাররাসূলি- অর্থ রসূলদের থেকে লা- অর্থ না বাচক শব্দ। (আঃ অভিঃ পৃ.২১১৯)। আয়াতের অর্থটি হবে "আমি কি তোমার পূর্বে এমন রাসূল পাঠাইনি যারা নবী নহে?" এই আয়াত অনুসারে জানা গেল পূর্বে অনেক রসূল এসেছে যারা নবী ছিলনা, শুধু রসূল। অর্থাৎ নবীর কাছথেকে রেসালতের প্রাপ্ত রসূল। এ রা ছিল ওহি ব্যতিত রসূল। "মা আরছালনা মিন কাবলিকা মিনাররাসূলি" "ইল্লা 'নু' ওহিই ইলাই হি"। ইল্লা অর্থ ব্যতিত (আঃ অভিঃ পৃ. ৪৬৪) হি. অর্থ সে বা তিনি (আঃ অভিঃ পৃ. ২২২৮)। তাহলে এই আয়াতের অর্থটি হল "আমি কি তোমার পূর্বে এমন রাসূল পাঠাইনি যাদের প্রতি ছিলনা কোন ওহী?" (আম্বিয়া ২৫) আর কুরআন প্রচার করাই হচ্ছে রসূলের কাজ (মায়েদা-৯৯)। অতএব প্রত্যেক রসূল নবী নহে। এই প্রচার অব্যাহত রাখার জন্য রিসালতের বিষয়টা হস্তান্তরযোগ্য করা হয়েছে (আনআম-১২৪)। যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের মধ্য থেকেই প্রতিনিধিত্ব দান করেন (নুর-৫৫)। এভাবে রসূল পদটি পর্যায়ক্রমে হস্তান্তরের মাধ্যমে চালু থাকে। পক্ষান্তরে নবী পদটি হস্তান্তযোগ্য নহে। তাই প্রত্যেক নবীর শেষাংশে একজন বিশ্বস্ত রসূলের কাছে রেসালত হস্তান্তরের মাধ্যমে একজন বিশ্বস্ত রসূল রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার নবীদের কাছ থেকে আল্লাহ নেন। (ইমরান-৮১)। এইভাবে প্রত্যেক নবী তার শেষাংশে একজনকে রেসালাতের ভার দিয়ে রসূল হিসাবে রেখে গেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় মুসা (আঃ) হারুনকে তার স্থলাভিশিক্ত করেন (আরাফ-১৪২)। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে পর্যায়ক্রমে রসূল এসেছে (বাকারা-৮৭)। দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়ডেও রসূল ছিল। (মায়েদা-১৯)। এই আয়াতে ফাতারাতি শব্দ এসেছে, ফাতারাতি শন্দের অর্থ হচ্ছে দুই নবীর মধ্যবর্তী সময়কাল। (আঃ অভিঃ পৃঃ ১৮৬২)। রিসালাতের ধারাবাহিকতায় একের পর এক আল্লাহ রসূল পাঠিয়েছেন। (মমিন-৪৪) প্রত্যেক নবীর মতই নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর কাছথেকেও একই ভাবে তার শেষাংশে বিশ্বস্ত রসূল রেখে যাওয়ার অঙ্গিকার নেওয়া হয়েছিল । এই মর্মে আল্লাহ বলেন, নবীদের কাছ থেকে যখন অঙ্গিকার দিয়েছিলাম, হে মুহাম্মদ তোমার কাছ থেকেও তখন একই অঙ্গিকার নিয়েছিলাম (আহযাব-৭)। আর তাই নবী মোহাম্মদ (সঃ) এর শেষাংশে তার বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আলী (রাঃ)-কে রিসালাতের ভার দিয়ে বিশ্বস্ত রসূল হিসাবে রেখে গিয়ে সূরা ইমরানের ৮১ নং আয়াতের অঙ্গিকার পালন করে গেছেন। আর হযরত আলী (রাঃ) সূরা নূরের ৫৫ নং আয়াতের শর্ত স্বাপেক্ষে তার পরবর্তী হাসান বস্রী (রাঃ)কে তার স্থলাভিশিক্ত করে প্রতিনিধিত্ব দান করেন, এইভাবে ধারাবাহিক ভাবে বর্তমান পর্যন্ত রসূল ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। বর্তমানে রসূলের গুণবাচক নামের মাধ্যমে রসূলগণকে চিনে নেওয়ার প্রয়োজন। এখানে উল্লেখ্য যে, রসূলের গুণবাচক নাম গুরু (বাকারা-১৫১) বর্তমানে সম্যক গুরুগণই রসূল। অর্থাৎ যার যার গুরু তার তার রসূল এতে কোন সন্দেহ নাই, এরাই কোরআন প্রচারের দায়িত্বে আছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, রসূলের কোন বিকল্প নেই। অনেকেই বলে, বর্তমান আলেমগণ নবীর ওয়ারিশ, এই কথার কোন ভিত্তি নেই। দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূল ব্যতীত তৃতীয় কোন ব্যক্তির আনুগত্য করা যাবে না। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ বিম্বাস কর, রসূল বিশ্বাস কর, কিন্তি তিন বলিওনা (নেসা-১৭১)। যারা রসূলের বিকল্প হিসাবে আলেমগণকে মনে করে তারা দ্বীনের ক্ষেত্রে তিনপন্থীতে গণ্য। এরা বলে আল্লাহ তিনের ভিতরে একজন (মায়েদা-৭৩)। তিনপন্থী দ্বীনের ক্ষেত্রে শেরেক পন্থী। আলেমগণকে রসূলের বিকল্প হিসাবে বা নবীর ওয়ারিশ হিসাবে তাদেরকে ইমাম সাব্যস্থ করে তাদের আনুগত্য করে বিধায় উহারা তিনপন্থী আর তাই উহারা শেরেক পন্থী। অনেকেই রসূল ভিন্ন দ্বীনের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে পীরের আনুগত্য করে এই যুক্তিতে তারাও তিনপন্থী বিধায় তিন পন্থী পীরপন্থীগণ শেরেক পন্থী। তাই এদেরকে বর্জন করা উচিত। তাই সম্যক গুরুগণই রসূল। বর্তমান সম্যক গুরু তথা রসূলের সঙ্গ ধারণ না করে যারা মারা যাবে তারা সেদিন নিজের হস্ত ধ্বংশন করে বলবে, হায় আমি যদি ঐ রসূলের সঙ্গ ধারণ করে সৎ পথ গ্রহণ করিতাম (ফোরকান-২৭)। উপরোক্ত আলোচনা অনুসারে জানা গেল সম্যক গুরুই রসূল এটাই কোরআন মাফিক রসূল বিশ্বাস আর কোরআন মাফিক আল্লাহ বিশ্বাস যার নাই সে মনিন নহে তারাই ক্ষতিগ্রস্থ। (আছর-১)। (বি. দ্র. এই পুস্তকের সম্যক গুরু রাসূল অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন)।

আলোচনা নং-৩ : আখিরাত বিশ্বাস সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন

ইবলিসের অনুসারীগণ আখিরাত সম্পর্কে মানুষকে এই ভাবে আরোও বিভ্রান্তি করে বলে যে, মৃত্যুর পরে কবরে জীবিত করে 'মান রাব্বুকা', মান দ্বীনুকা, মান হাজা রাজুলুন' এই তিনটি প্রশ্ন করে ঈমান পরীক্ষা করা হবে, যাহারা এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর যথার্থভাবে দিতে পারবে তারা সফলকাম হবে, তাদের এই কথাটি ঠিক নহে, কারণ ইবলিশও এই তিনটি প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে সক্ষম। ইবলিশকে যদি প্রশ্ন করা হবে, মান রাব্বুকা- তোমার প্রভু কে? তখন সে যথার্থ উত্তর দিবে, আমার প্রভু আল্লাহ। (হিযর-৩৬) তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে, মান দ্বীনুকা, তোমার দ্বীন কি? তখন সে যথার্থ উত্তর দিয়ে বলবে, আমিতো আল্লাহতেই আত্মসমর্পন কারী (ইমরান-৮৩) কাজেই ইসলাম আমার দ্বীন। আবার মান হাজা রাজুলুন, মুহাম্মদ (সঃ)কে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, তখন সে বলবে হ্যাঁ চিনি, ইনিতো নবী মুহাম্মদ (সঃ)। কাজেই দেখা গেল ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীগণ উপরোক্ত তিনটি প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে সক্ষম হয়ে যায়। বিধায় তারা সেদিন পরিত্রাণযোগ্য বলে গণ্য হয়। কিন্তু ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীগণ কখনোই পরিত্রাণযোগ্য বলে গণ্য হবে না। বিধায় উপরোক্ত তিনটি প্রশ্নের মাধ্যমে মৃত্যুর পরে ঈমান পরীক্ষা করা হবেনা, কারণ এই মর্মে পবিত্র কোরআনে কোন আয়াত আসে নাই। বরং আয়াত আসছে, মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত করে প্রভুর কাছে নিয়ে গিয়ে সেদিন (মানব আকৃতি বিশিষ্ট) আল্লাহর পায়ে সেজদার মাধ্যমে ঈমান পরীক্ষা করা হবে, কিন্তু সেদিন ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীগণ আল্লাহর পায়ে সেজদা দিতে সক্ষম হবে না (কালাম-৪২)। এখানে উল্লেখ্য যে, নবী ওহী ব্যতিত কাউকে সতর্ক করে নাই। (আম্বিয়া-৪৫) কারণ নবী (সঃ) গায়েব সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন না। (আনআম-৫০) (আরাফ-১৮৮) আল্লাহ ছাড়া কেহ গায়েব জানেনা। (নামল-৬৫) যেহেতু মৃত্যুর পরের জগতটা গায়েব জগত, সেহেতু মৃত্যুর পরের কোন বিষয়ে কোরআন ব্যতিত অন্য সকল কথাই বিভ্রান্তিকর। এটা নিশ্চিত। সেহেতু আখিরাতের বিষয়ে হাদিসের উদ্ধতিমূলক কথা বর্জনীয়। এরা আখেরাত সম্পর্কে আরো বিভ্রান্তি করে বলে যে, মৃত্যুর পরে রোজ কেয়ামত পর্যন্ত কবরেই অবস্থান করবে। কিন্তু কথাটা ঠিক নহে, কারণ আল্লাহ বলেন, তোমাদের জন্য দুই বার মৃত্যু, দুইবার জীবন দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। (মমিন-১১)। এখানে উল্লেখ্য যে, যেহেতু দুইবার মৃত্যুর কথা উল্লেখ আসছে, সেক্ষেত্রে ধরুন রোজ কেয়ামতের মুহুর্তে যে লোকটি মারা গেল সেক্ষেত্রে তো দুইবার মৃত্যু হইল না, সেতো একবারই মৃত্যু বরণ করল। আর সেক্ষেত্রে আখেরাত সম্পর্কে প্রচলিত ধর্ম দর্শনে সূরা মমিনের ১১ নং আয়াতটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিদায় আখেরাত সম্পর্কে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস বর্জনীয়, বরং মৃত্যুর পরে আল্লাহর পায়ে সেজদার মাধ্যমে ঈমান পরীক্ষা করে (কালাম-৪২) কর্ম অনুসারে প্রতিদান প্রদান করার লক্ষ্যে তাকে আলমে বরযখে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে (মমিন-১০০)। এই লক্ষ্যে পুনরায় তাকে সৃষ্টিতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করা হচ্ছে। (আরাফ-২৯) এইভাবে জন্ম জন্তান্তরে প্রত্যেক মানুষ রোজ কিয়ামতের পূর্ব দিন পর্যন্ত পৌছাচ্ছে বিধায় যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মারা যাচ্ছে, তিনিও ইতিপূর্বে একাধিকবার মৃত্যুবরণ করেছে বিধায় তার ক্ষেত্রেও সূরা মমিন-১১ নং আয়াতে উল্লেখিত দুইবার মৃত্যুরণ কথাটা প্রযোজ্য, অতএব যারা জন্তান্তরবাদে বিশ্বাসী নয়, বিধায় তারা কোরআন মাফিক আখেরাত বিশ্বাসী নয়। (বিঃ দ্রঃ এই পুস্তকের জন্মান্তরবাদ অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন) বিধায় তারা মমিন নহে। উহারাই ক্ষতির ভিতর নিমজ্জিত (আছর-১) এদেরকে বর্জন করে কুরআন মাফিক আখেরাত বিশ্বাসী হওয়া আবশ্যক।

আলোচনা নং-৪ ঃ সালাত সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন

অনেকেই মানুষকে কুরআন দর্শন থেকে বিরত রাখার জন্য বলে 'সালাত জান্নাতের চাবি' কিন্ত না, কারণ সালাত ব্যতিত মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে এমন আয়াত আসে নাই, রবং ঈমান এবং সৎ কর্ম ব্যতীত মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে এমন আয়াত এসেছে (আসর-১)। বরং আয়াত এসেছে, 'হে মমিন তোমরা সালাত কায়েম কর' (ইব্রাহিত-৩১)। অর্থাৎ আগে ইমান ও সৎকর্ম, পরে সালাত (বাকারা-২৭৭)। এতে প্রমাণ হয় যে সালাত জান্নাতের চাবি নহে বরং ঈমান এবং সৎ কর্মই জান্নাতের চাবি। তাচাড়া এই মর্মে কোন আয়াত কুরআনে নেই। তাই ঈমান অর্জন না করে যদি কেহ শুধু লোক দেখানো সালাত আদায় করে তাহলে সে জান্নাতে যেতে পারবে না। ইবলিশের অনুসারীগণ আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা আরোপ করে বলে যে, আল্লাহ বলেছেন ৫ (পাঁচ) ওয়াক্ত সালাত আদায় করলেই পাঁচটা পুরস্কার দেয়া হবে। (১) দুনিয়াতে রিজিকের ফয়সালা (২) কবরে শওয়াল জওয়াব সহজ (৩) ত্বড়িৎ গতিতে পুলসিরাত পার (৪) হাশরের দিন আমলনামা ডান হতে (৫) বিনা হিসাবে জান্নাত লাভ। কিন্তু এই মর্মে পবিত্র কুরআনে কোন আয়াত আসে নাই। বিধায় এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। কারণ পূর্ব আলোচনার মতে আগে ইমান, পরে সালাত, এখন যদি কেহ পবিত্র কুরআন মাফিক তথা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ঈমান অর্জন (বি. দ্র. উল্লিখিত গ্রন্থের 'আদম সেজদার রহমস্য ও ঈমান ও সালাত' অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন) না করে সরাসরি প্রচলিত পদ্ধেিত লোক দেখানো সালাত আদায় করে তাহলে তাদের সালাত ইবলিশ থেকে নিরাপদ নয়। কারণ তারা আদম কাবায় সেজদা করে নাই বিধায় তাদের সালাতে ইবলিশের অনুপ্রবেশ ঘটে, ফলে উহাদের মন সালাতে স্থির থাকেনা বিদায় উহাদের জন্য সালাত কঠিন হয়ে যায়। (বাকারা-৪৫) ফলে তাহারা সালাত হেফাতকারী নহে, বিধায় তাহারা জান্নাতে যেতে পারবে না। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, লোক দেখানো সালাত আদায়কারী জান্নাতে যেতে পারবে না (মাউন-৬)। পক্ষান্তরে যাদের সালাত ইবলিশ থেকে নিরাপদ উহারাই সালাত হেফাজতকারী আর যারা সালাত হেফাজতকারী, তাদের জন্য জান্নাত (মাআরিজ-৩৪)। অতএব, প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করলেই ৫টা পুরস্কার দেয়া হবে এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। অনেকেই মানুষকে আরও ভিভ্রান্তি করে বলেন যে, জামাতের সাথে সালাত আদায় করা ফরয, কিন্তু না, জামাতের সাথে ইমামের পিছনে সালাত আদায় করতে হবে মর্মে পবিত্র কোরআনে কোন আয়াত আসে নাই, বিধায় জামাতের সাথে সালাত আদায় করা ফরজ নহে। কারণ সালাত এবং মাথানত করা দুইটি বিষয়। এখন যদি কেহ মাথানত করার বিষয়টা সালাতের মধ্যে নিয়ে যায় তাহলে সূরা বাকারার ৪৩ নং আয়াতে উল্লিখিত মাথানত করার যে আদেশটি ছিল তাহা ব্যর্থ হবে। এই আয়াতে বলা হয়েছে সালাত কায়েম কর; যাকাত আদায় কর এবং মাথানতকারীর সাথে মাথানত কর। এখানে সালাত কায়েম করা একটা বিষয় আর মাথানতকারীর সাথে মাথানত করা আরেকটা বিষয়। কাজেই মাথানত করা বা রুকু করা সালাতের অংশ নয়। এই আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন মাথানতকারীর সাথে গিয়ে রসূলের কাছে তথা রসূল সুরতে আল্লাহর কাছে মাথানত করা আর সেটা হচ্ছে সম্যক গুরো তথা রসূলের কাছে মাথানত করতে বলাই হচ্ছে এই আয়াতের উদ্দেশ্য। আর যারা আয়াতের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (হজ্জ্ব-৫১)। যেহেতু মসজিদের বেতনভুক্তো ইমামগণ রসূল নহে। আর দ্বীনের ক্ষেত্রে একমাত্র রসূল ব্যতীত তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে আনুগত্য করার কোন বিদান নেই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তুমি আল্লাহ বিম্বাস কর, রসূল বিশ্বাস কর কিন্তু তিন বলিওনা (নেছা-১৭১)। কাজেই একমাত্র রসূল ভিন্ন অন্যকোন তৃতীয় ব্যক্তিকে দ্বীনের ক্ষেত্রে ঈমাম সাব্যস্ত করে তার আনুগত্য করলে দ্বীনের ক্ষেত্রে সেটা তিনপন্থী বলে গণ্য হবে। বিধায় সেটা শেরেকে গণ্য হবে। তারপরও অনেকে বলে শুক্রবারে মসজিদে যাওয়াকে সূরা জুমুয়া-৯ নং আয়াত অনুসারে ফরজ বলে গণ্য করেন। কিন্তু উল্লেখ্য যে, জুম্মাআর দিনে মসজিদে যেতে হবে এই আয়াতে তা উল্লেখ নেই, এই আয়াতে বলা হয়েছে, জুমআর দিনে সালাতের জন্য যখন আহবান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্বরণে ধাবিত হও। (জুমায়া-৯) এখানে মসজিদে যাওয়ার কথা উল্লেখ নাই। অনেকেই জুমুআ শব্দ দিয়ে মসজিদকে বুঝায়, কিন্তু না মসজিদ অর্থ সেজদার স্থান (আরবী অভিধান পৃষ্ঠা নং- ২২৪৫)। পক্ষান্তরে জুমুআ অর্থ সম্মেলন (আরবী অভিধান পৃষ্ঠা নং- ১১১৪)। তারপরও উল্লিখিত আয়াতে অর্থাৎ সুরা জুমুআ-র আয়াত নং-৯ এ বলা হয়েছে, হে মমিনগণ, এখানে হে মমিনগণ বলতে মমিন নর-নারী সকলকে বুঝায়। সেক্ষেত্রে মমিন নারীদের ক্ষেত্রে মসজিদের যাওয়ার বিষয়টা জরুরী হয়ে যায় বিধায় উক্ত আয়াতে মসজিদে যাওয়ার কথাটা উল্লেখ আসে নাই।
তবে যদি কেহ মসজিদে যায় তাতে কোন ক্ষতিও নাই। তবে সেটা মক্কা ও তার চারপাশের লোকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, মক্কা ও তার চারপাশের লোকদের বলুন তারা যেন আখিরাত বিশ্বাস করে ও সালাত হেফাজত করে (সূরা আনআম-৯২)। অতএব, জুমুআর দিনে পবিত্র কাবাঘরে সালাত আদায় করার বিষয়টা মক্কা ও তার চারপাশের লোকদের জন্য প্রযোজ্য। কারণ দূর দূরান্তের লোকদের জন্য সেটা জুলুমে গণ্য হবে। কিন্তু আল্লাহ দ্বীনের বিষয়ে কারো প্রতি জুলুম করে না। বাকারা-২৫৬ ও হজ্বের ৭৮)। এখানে উল্লেখ্য যে, যে সকল মসজিদ মুসলমানদের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে তৈরী, সে সকল মসজিদে যাওয়া নিষেধ করা হয়েছে (তওবা-১০৭ ও ১০৮)। এইজন্য আল্লাহ বলেন, প্রয়োজনে তোমাদের বাসগৃহে সালাতের স্থান নির্ধারণ কর। (ইউনুস-৮৭) কারণ বর্তমান কিতাবীদের দ্বারা অধিকাংশ মসজিদ পরিচালিত, আর আল্লাহ বলেন, তোমরা কিতাবীদের দল বিশেষের আনুগত্য করিও না উহারা তোমাকে কাফের বানিয়ে ছাড়বে। (ইমরান-১০০)। কাজেই সে সকল মসযিদ মমিনদের দ্বারা পরিচালিত নহে, সে সকল মসজিদে না যাওয়াই উত্তম। এখানে উল্লেখ্য যে, অনেকেই মনে করে যে ফযর, যোহর, আছর, মাগরিব, ইসা, সালাতের নাম, কিন্তু না। এগুলো আরবী ভাষায় সময়ের নাম। প্রাচীন কাল থেকে আরবী ভাষায় এই নামগুলি সময়ের তালিকায় এসেছে। কোন কোন সময় মানুষ ফজরের সময়ে সালাতও আদায় করছে। এজন্য পবিত্র কুরআনে গোপনীয় সময় উল্লেখ করতে গিয়ে ফজরের সালাতের পূর্বে এবং এশার সালাতের পরে গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ আসছে (নূর-৫৮)। তবে উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে ফজরের সালাত কায়েম কর উল্লেখ নাই, তাই ফজরের সালাত ফরয নহে। অনেকেই বলে (সঃ) মেরাজে গিয়ে ৫ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে এসেছেন, একথার কোন ভিত্তি নাই। কারণে সালাতের উদ্দেশ্যে মেরাজ নহে, বরং প্রভুর দর্শনের উদ্দেশ্যে মেরাজ। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, কোন এক রজনীতে প্রভুর দর্শনের উদ্দেশ্যে, মসজিদুল হারাম হইতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত এক বরকতময় পরিবেশে নবী (সঃ)কে তার প্রভু ভ্রমণ করাইয়াছিলেন। (বনি ইসরাইল-১) এবং ঐ দিন সিদরাতুল মুনতাহার নিকট নবী (সঃ) তাঁর প্রভুর দর্শন লাভ করেছিলেন। (নাজম-১৩ ও ১৪) আর পবিত্র কুরআনে এই মেরাজ সম্পর্কে অতিরিক্ত আর কোন আয়াত নেই। এতে মিরাজ থেকে ৫ ওয়াক্ত সালাত এনেছে উপরোক্ত আয়াতে তা প্রমাণ হয় না বিধায় যারা বলেন, নবী (সঃ) মেরাজ থেকে ৫ ওয়াক্ত সালাত এনেছে তারা মিরাজ সম্পর্কে মিথ্যারোপকারী এতে কোন সন্দেহ নাই।
ইহা পবিত্র কোরআনের বুঝ, আর এই কুরআনই একমাত্র সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী। (বাকরা-১৮৫) যারা এই সত্য হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল ও মুখ ফিরাইয়া নিল, জাহান্নাম তাদেরকে ডাকবে। (মাআরিজ-১৭)। অতএব, যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে নাই, এরা ইবলিশের অনুসারী। আর তাই যারা আদম কাবায় সেজদাকারী নহে বিধায় এদেরেকে বর্জন করে একজন সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ইবলিশ মুক্ত হয়ে প্রকৃত সালাত কায়েম করতঃ মমিন হওয়া মানব মুক্তির একমাত্র পথ। কাজেই বিষয় ভিত্তিক কুরআন অনুসারে জ্ঞান অর্জন করা আমাদের সকলের জন্য জরুরী।

ধর্ম নিরপেক্ষতা কুরআনের মতবাদ

অনেকেই বলে ধর্ম নিরপেক্ষতা নাকি ধর্মহীনতা। তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ ধর্ম নিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নহে। বরং রাষ্ট্রের জন্য ধর্ম নিরপেক্ষবাদই হচ্ছে পবিত্র কুরআনের মতবাদ। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, 'লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিইয়াদ্বীন' তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে। (কাফিরুন-৬)। যে রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ আইন থাকে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মমত প্রকাশ করার অবকাশ পায়, যার ধর্ম সার্বজনিন গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয় মানব জাতীর জন্য একসময় সেই সার্বজনিন গ্রহণযোগ্য ধর্মে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়। যেহেতু কুরআনই বিশ্বের কাছে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য কিতাব বিধায় এই কোরান প্রকাশ পেলে একসময় বিশ্বের সকল মানুষ এই কুরআনের দর্শনে ফিরে আসবে। সেই লক্ষ্যে এই কুরআন প্রকাশ করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদই সমগ্র বিশ্বে উত্তম পন্থা বলে বিবেচিত, আর সেই কাজটি যারা প্রত্যাখ্যান করে তারা কুরআনকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় বলে বিবেচিত হবে। রাষ্ট্রের রাজা, বাদশা, প্রেসিডেন্ট তথা প্রশাসিনক কাজে নিযোজিত ব্যক্তিবর্গকে উলিল আমর বলে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা উলিল আমরগণের আনুগত্য কর (নেসা-৫৯)। এই আয়াত অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনার আদেশদাতাগণকে দুনিয়াবী ক্ষেত্রে আনুগত্য করতে হবে। অনেকেই বলে সুরা নেসার ৫৯ নং আয়াতে উল্লিখিত উলিল আমরের আনুগত্য কর বলতে দুনিয়াবী ক্ষেত্রে আনুগত্য করা নহে, এটা দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূল ভিন্ন অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তিকে আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। তাদের এ কথা ঠিক নহে, কারণ এই আয়াতটি যখন নাজিল হয় তখন নবী করীম (সঃ) জীবিত। আর তখন এই আয়াত অনুসারে নবী (সঃ) এর পরেও তৃতীয় ব্যক্তিকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করার প্রয়োজন হইত। কেননা আয়াতটি তখনকার সময়ে মমিনদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। তখন কিন্তু সাহাবীরা নবী করিম (সাঃ) ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তিকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করেছে, এমন কোন প্রমাণ নেই বিধায় এই আয়াতে দ্বীনের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তির আনুগত্য করার কথা বলা হয় নাই বরং এটা দুনিয়াবী ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় আদেশদাতাগণের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে, এটা নিশ্চিত। (বি. দ্রঃ এই পুস্তকের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আনুগত্য করা ফরয অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন।) মনে রাখবেন, কুরআনের একটি আয়াত পালন করলেই তাতে মমিন বলা যাবে না, পক্ষান্তরে একটি আয়াত অমান্য করলে তাকে কাফির বলা যাবে। অতএব যারা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আনুগত্য করেন না, তারা সুরা নেছার ৫৯ নং আয়াতটি অমান্যকারী বলে গণ্য হবে। এরা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ। অতএব যারা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতায় নিমজ্জিত, তাদেরকে বর্জন করাই উত্তম। আর অজ্ঞ ব্যক্তিদেরকে বর্জন করার জন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা অজ্ঞদেরকে পরিহার কর। (আরাফ, ১৯৯)।
কাজেই বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান ভিত্তিক দর্শনের যুগে একমাত্র কুরআনের দর্শন ছাড়া দ্বীন সম্পর্কে মানুষের মতবাদ পরিহারযোগ্য। মনে রাখবেন, ধর্ম হচ্ছে যার যার, রাষ্ট্রে হচ্ছে সবার। কাজেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে বিতর্কিত না করাই ধর্মের জন্য মঙ্গল। আর তাই রাষ্ট্র সব সময় ধর্মের বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকবে এটাই কাম্য। এখানে উল্লেখ্য যে, বর্তমান দেশ ও জাতী ধর্ম বিভ্রান্তি দ্বারা আক্রান্ত। আর এই ধর্ম বিভ্রান্তিকে ধর্ম দিয়েই তথা কুরআন দিয়ে প্রতিহত করা উচিত। কারণ আল্লাহ বলেন, তোমরা যাহা দ্বারা আক্রান্ত হবে, তাহা দ্বারা প্রতিহত করবে। (বাকারা-১৯৪)। কাজেই ধর্ম বিভ্রান্তি থেকে দেশ ও জাতীকে রক্ষা করতে হলে কুরআনের দর্শন প্রচার করা একমাত্র উপায়।

নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর ক্ষেত্রে চুল, দাড়ি ও গোঁফ আল্লাহর দেওয়া
সুন্নত হিসেবে প্রযোজ্য ছিল

আল্লাহ বলেন, ইন্নাল্লাজি ফারাদ্বা আলাইকাল কোরআন। অর্থ: আল্লাহ আপনার প্রতি কোরআনকে বিধান করেছেন (২৮ ঃ ৮৫)। এ আয়াতে ফারাদ্বা শব্দ এসেছে যার অর্থ বিধান। আর আল্লাহ যে নিয়মের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেটাকে আল্লাহর সুন্নত বলে। যেমন, আম গাছে আম ধরছে, কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল ধরছে এটা আল্লাহর সুন্নত। যেমনটি মানুষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেয়েদের চুল আছে, কিন্তু দাড়ি ও গোঁফ নাই। তাই মেয়েদের ক্ষেত্রে চুল আল্লাহর দেওয়া সুন্নত। তদ্রুপ পুরুষের ক্ষেত্রে চুল দাড়ি ও গোঁফ আল্লাহর দেওয়া সুন্নত। আর তাই আদম রসুলের ক্ষেত্রে চুল দাড়ি ও গোঁফ আল্লাহর দেওয়া সুন্নত হিসেবে প্রযোজ্য ছিল। আর আল্লাহ বলেন, “সুন্নাতা মান ক্বাদ আরসালনা কাবলিকা মিনাররাসুলিনা ওয়া লা তাজিদু লি-সুন্নাতিনা তাহওয়ীলা।” অর্থ: তোমার পূর্বে আমার প্রেরিত রসুলদের ক্ষেত্রে আমার যেরূপ সুন্নত প্রযোজ্য ছিল, (আপনার ক্ষেত্রেও সেই একই সুন্নত প্রযোজ্য হবে) আর আমার সুন্নতের কোন পরিবর্তন হবে না (১৭ ঃ ৭৭)। আবার আল্লাহ বলেন, সুন্নাতিল্লাহিল্লাতি ক্বাদ খালাত মিন কাবলু ওয়ালান তাজিদা লি সুন্নাতিল্লাহি তাবদিলা। অর্থ: প্রাচীনকাল থেকে আল্লাহর যে সুন্নত চলে আসিতেছে (আপনার ক্ষেত্রেও তেমনটি সুন্নত প্রযোজ্য হবে) আর আমার সুন্নতের কোন পরিবর্তন নাই (৪৮ ঃ ২৩)। তাহলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকে অতীত রসুলদের ক্ষেত্রে চুল দাড়ি ও গোঁফ আল্লাহর দেওয়া সুন্নত হিসেবে প্রযোজ্য ছিল। তাই উক্ত দুটি আয়াতের নির্দেশ অনুসারে নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে চুল দাড়ি ও গোফ আল্লাহর দেওয়া সুন্নত হিসেবে প্রযোজ্য ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, একমাত্র হজ্বের সময় মাথা মু-নের নির্দেশ আসছে। তাছাড়া অন্য কোন সময়ে চুল দাড়ি গোঁফ কর্তনের নির্দেশ কিংবা চুল দাড়ি গোফ রাখা হারাম মর্মে কোরানের কোন আয়াতে আসে নাই। বিধায় নবী মুহাম্মদ (সঃ) চুল দাড়ি গোঁফ কর্তন করার মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া সুন্নত পরিবর্তন করেন নাই। তবে হযরত ইমাম হোসেন (আঃ)কে কারবালার প্রান্তরে হত্যার পরে এজিদ দ্বীনের বিপরীত সুন্নত চালু করার লক্ষে চুল ও গোঁফ কর্তন করার মাধ্যমে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা আল্লাহর দেওয়া সুন্নত পরিবর্তন করে। তাই যারা চুল ও গোঁফ কর্তন করে তারা এজিদের অনুসারী। আর যারা চুল দাড়ি ও গোঁফ কর্তন করে না তারা নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসারী। তাই চুল দাড়ি ও গোঁফ কর্তন না করে নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসারী হওয়া দরকার।

 

 

-: জয়গুরু :-


পবিত্র কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা